পুতুল নাচের ইতিকথা PDF Download মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

“পুতুল নাচের ইতিকথা” উপন্যাসটির রচয়িতা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। এটি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চতুর্থ মুদ্রিত গ্রন্থ ও তৃতীয় উপন্যাস। বাংলা ১৩৪১ সালের পৌষ থেকে ১৩৪২ সালের অগ্রহায়ণ পর্যন্ত ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায় উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ইংরেজী ১৯৩৬ সালে উপন্যাসটি গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচিত মোট ৩৭ টি উপন্যাসের মধ্যে এটি অন্যতম একটি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। উপন্যাসটি ১৯৩৬ সালে প্রথম গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হবার পর, ইংরেজী(১৯৬৮), কানাড়ি, চেক, হিন্দী, সুইডিশ, গুজরাটি, তেলেগু ও অন্যান্য ভাষায় রুপান্তরিত হয়।

“পুতুল নাচের ইতিকথা” উপন্যাসটির সূচনায় যে নাটকীয়তা লক্ষ্য করা যায়, তা শত শত উপন্যাস পাঠ করে থাকলেও পাঠক যে শুধুমাত্র হাতে গোনা অল্প কিছু সংখ্যক উপন্যাসেই এই নাটকীয়তার সদৃশ পাবেন তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তারপরেও এই উপন্যাসের কাছাকাছি সেসব উপন্যাসের সূচনা আসতে পারবে কি না! সন্দেহ থেকেই যায়।উপন্যাসের সূচনার নাটকীয়তার দিক থেকে “One Hundred Years of Solitude” উপন্যাসটির সাদৃশ্য রয়েছে।

মানুষের জীবন একটা রঙ্গমঞ্চ বৈকি। সেই মঞ্চে মানুষ পুতুল নাচের পাত্র। মানুষ জানে না তাকে কি কেউ বাঁধন ধরে নাচাচ্ছে কি না, তার জীবনের সিদ্ধান্তগুলোতে প্রভাব ফেলছে কি না।আর মানুষ জানলেও কী সে বাঁধন ছিঁড়ে ফেলতে চায়? না, সে বাঁধন তার কাছে অতি মধুর, হয়তো পুতুল নাচের পুতুলের মতই বাঁধনে জড়িয়ে থাকতে মানুষ ভালোবাসে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রঙ্গমঞ্চের পুতুল নাচের মধ্য দিয়েই মানবজীবনকে ফুটিয়ে তুলেছেন এই উপন্যাসে।উপন্যাসটির মূল পটভূমি হলো গাওদিয়া নামক একটি গ্রাম। তবে গল্পের ভেতর অগ্রসর হতে শুরু করলেই পাঠক লক্ষ্য করবেন যে, গল্পের তাগিদে গাওদিয়ার আশেপাশের গ্রাম, এমনকি সুদূর কোলকাতা শহরেও চরিত্রদের নিয়ে গেছেন লেখক।

শশী গাওদিয়া গ্রামের ছেলে, উপন্যাসের অন্যতম মূল চরিত্র।কোলকাতা শহর থেকে ডাক্তারী পাশ করে, গাঁয়েই আবার বসবাস শুরু করেছে। গাঁয়ে তার জীবন, সেখানকার মানুষদের সাথে তার সম্পর্ক, তাদের সকলের জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এসবই হলো উপন্যাসটির মূল উপজীব্য।

পুরানে বর্ণিত আছে, দৈত্যকুলের অত্যাচারী রাজা হিরণ্যকশ্যিপু এবং ঈশ্বরের আরাধ্য করুনাময় তাঁর পুত্র প্রহলাদের কাহিনী। উপন্যাসটিতে পিতা গোপাল আর পুত্র শশী তাদেরই যেন পরিবর্তিত রূপ। গোপাল মানুষকে ঠকিয়ে, সর্বনাশ করে, কোণঠাসা করে কিভাবে টাকা বা নিজের স্বার্থ আদায় করা যায় তাই ভাবে।

অপরদিকে শশী নিষ্ঠাবান, পরোপকারী ও নির্লোভ। গোপাল হাজার চেষ্টা করেও ছেলেকে নিজের দলে টেনে আনতে পারে না। অপরদিকে শশীর মানসিকতা দ্বিমুখী, সে যেন নিজেকে চিনতে ব্যর্থ হয়। কখনো তার মনে হয় আমৃত্যু সে গাঁয়ে থেকে যাবে, গাঁয়ের লোকদের ভালোবাসায় সিক্ত হবে।

আবার, কখনো বা ভাবে এই গাঁয়ে থেকে কী হবে? শহরে গেলে সে তার সকল স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে। লেখক উপন্যাসটিতে শশীকে দেখিয়েছেন একজন মানসিক দ্বন্দে ভোগা এক তরুণ হিসেবে, যে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে।এই সিদ্ধান্তহীনতার মাঝেই শশী এমন কাউকে খোঁজে যাকে আশ্র‍য় করে সে বাঁচতে চায়।

আর এই আশ্রয় হিসেবে শশীর মনে ধরে মতিকে। কিন্তু শশী নিজেও বুঝতে পারে না মতির প্রতি তার দূর্বলতা।কিন্তু, হঠাৎ একদিন কুমুদ যে কিনা, শশীর কলেজের বন্ধু গাওদিয়ায় এসে মতিকে বিয়ে করে দূরে নিয়ে যেতে চায়।

তখন শশীর যেন আঘাত লাগে, এক পর্যায়ে সে নিজেই মতিকে বিয়ে করবে মনস্থির করে। এ বিয়ের কথা শশী কুসুমকে বলে এবং কুসুম তা হেসে উড়িয়ে দেয়।

কুসুম একমাত্র চরিত্র যার কাছে শশী বারবার পরাজিত হয়। কুসুমের ভাব বুঝতেও শশীর কষ্ট হয়। কুসুম কি চায়! সে কী তাকে ভালোবাসে? মতি গাওদিয়া ছেড়ে চলে গেলে যাবার পর শশী বুঝতে পারে কুসুমই তার একমাত্র আশ্রয়স্থল।তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয় এবং কুসুম যখন গাওদিয়া ছাড়তে চায় তখন শশী বুঝতে পারে কুসুম তার জীবনে কতটা অপরিহার্য।

আর এর পর থেকেই উপন্যাসের পথরেখা পরিবর্তিত হয়। উপন্যাসটি যে পাঠককে ক্ষনে ক্ষনেই চমক দিবে এবং শেষ পর্যন্ত পাঠকের আগ্রহ ধরে রাখতে সমর্থ্য হবে তা বলাই বাহুল্য।মানুষের জীবন আর কল্পনা দু’টি ধারায় প্রবাহিত হয়।

কখনো জীবনে এই দুইয়ের সংমিশ্রণ হয়, তখন জীবন হয়ে উঠে ছন্দময়। আবার কখনো জীবন হয় তার বিপরীত কষ্টে জর্জরিত। লেখক মানবজীবনের যেই রূপ এই উপন্যাসে তুলে ধরেছেন তা আমাদের সকলের জীবনেরই গল্প।

আমরা যতই সবকিছু থেকে পৃথক থাকতে চাই না কেন আমরা কোন না কোন বাঁধনে জড়িয়ে যাই আর জীবন সেই সব বাঁধনকে ঘিরেই আবর্তিত হয়।

উপন্যাসটির উপস্থাপন, লেখকের ভাষার ব্যবহার পাঠককে মুগ্ধ করবে এবং যখন উপন্যাসটি শেষ হবে তখন হয়তো সকল পাঠকেরই মনে হবে প্রত্যেকটি চরিত্রই যেন আমাদের আশেপাশের কেউ।

Exit mobile version